শনিবার, ২০ জুন, ২০২০

নিভৃত দ্যোতনা

সুড়ঙ্গ শেষের যে আলো
তা কি কেবলই অনুপ্রেরণার? 
মাঝে মাঝে ট্রেনের হেডলাইট হয়ে এসেও তো, 
চুরমার করে দিয়ে যায় 
গল্পের শেষটা। 

জীবন তবুও ফিরে আসে
তন্দ্রাহারা নিশীথের ক্লান্তিহীন দীর্ঘশ্বাসে,
অথবা এমনই নিরন্তর বয়ে যায়
ফেলে আসা ঝরা পাতার বিছানায়। 
দিবসের জেগে থাকা কোনো স্বপনে,
দমকে আন্দোলিত অনুরণনে। 

তারপর পৃথিবীতে পার করে অনেক বেলা,
সে কি হয় তৃপ্ত? 
প্রশান্ত আত্মার মতো! 
না কি দূর কোনো পর্বতের আরাধ্য ছায়ায়, 
আলেয়ার অলীক মায়ায়, 
সুড়ঙ্গের শেষ আলোর মুখ
আজও সে খুঁজে বেড়ায়? 

রবিবার, ৫ এপ্রিল, ২০২০

কিছু ছন্নছাড়া সময়ের গল্প ৭

প্রেমহীনতার এই শহরে
থাকছি না আর
সময় কোথায় সময় হারাবার!

যেথায় ফুঁ দিলেই একটা পাতা পাখি হয়ে উড়ে যায় 
হাতের তুড়িতে কাগজের নৌকা ভেসে বেড়ায়, 
জাদুর নদীর ওপারে! 
সেথায় ওক কাঠের ঘন বেড়ার ফাঁকে 
মায়াবী জোড়া চোখের মত চেয়ে থাকে 
বেগুন রঙা পিটুনিয়া 
আর টকটকে লাল ইরিথ্রিনা। 
টিনের চালায় থামে না একজোড়া চড়াইয়ের মিষ্টি খুনসুটি
যতক্ষণ না নামছে অঝোর ধারার ঘোরলাগা বৃষ্টি।

রাত হলে যেখানে চাঁদের গা থেকে 
মুঠো মুঠো রূপো ঝরে     
ভালোবাসা হয়ে,
সেখানে স্বপ্ন সাজাবো বলে
একদিন ছুটি নেবো 
তোমাদের লকড ডাউন এই পৃথিবী থেকে!                 
 ছবি ঃইন্টারনেট   

রবিবার, ২২ ডিসেম্বর, ২০১৯

টুকরো জীবন ১০

আমার গল্পেরা জমা হতো চোখের তারায়
সন্ধ্যাতারার সাথে থেকে
গল্প শোনার সাথী হতে 
তোমার আগ্রহে মুগ্ধ হয়ে,
সে ভাষা তোমায় শিখিয়ে দিলাম পরে,

তুমি নিজেই গল্প লিখে দিলে।

চলে যাবার গল্পেও ত
রয়ে যায় স্মৃতি!
তবে তুমি বড্ডো একপেশে খেলে গেলে!
তাই, দীর্ঘ রাত্রির বুক চিড়ে
নির্দয় মঞ্চস্থ হলো,
পৃথিবীর আরেকটি পুরনো গল্প৷

খেরোখাতার ছেঁড়া পাতায় তাই এখন
গল্প বলিয়ে এক মেয়ের,
গল্প জমা হয়।

যে ভাষা বড়ো দুর্বোধ্য।। 

শনিবার, ২৩ নভেম্বর, ২০১৯

দরজার ওপাশে

অন্ধকারের আলো হিসেবে
এখনো শেষ বাতিটা জ্বলছে।
যদিও বহু আগেই নিভে গেছে
সূর্যালোকিত স্বচ্ছ জলে তার টিমটিমে ছায়া।

আধেক শহর ঘুমিয়ে
সামনের রেলিঙটায় দু'একটা
কাক এসে নেমে যায়
দূরে ছাতা হাতে অশীতিপর এক বৃদ্ধের কায়া!

পরের ছত্রে হয়তো
নিশ্চিত করাঘাতে কাঁপবে গোটা বাড়িটা।

ভালো থাকার কী এক আজন্ম লালসায়,
একটা জনম কেটে গেল
ঘোর অনিশ্চয়তায়।
আজও তাই শেষপ্রহরের করাঘাতে
দ্বিধান্বিত মানব মন
শেষ আলোটা হাতড়ে বেড়ায়,
নিঃসীম শূন্যতায়।

প্রতিশব্দের গল্প

আজকাল শব্দেরা,

জোনাকির মতো জ্বলে উঠে মাঝে মাঝে
রাত্রি গভীর হওয়ার অনেক আগেই,
তারপর ঢেকে যায়
অন্ধকার মৌন মিছিলে।

অথবা, দূর কোন নদীর বুক থেকে
ভেসে আসে এক চিলতে বাতাস হয়ে,
দোলা দেয় ধানের বাড়ন্ত শীষে
নীরবে, নিভৃতে।

একেকদিন বিকেলে ম্লান হয়ে যায়
যে আলো,
দিগন্তরখার ওপারে
আমার শব্দেরা হারায় কখনো তাদের সাথে। 

আর এভাবেই আমার যাপিত প্রতিটি দিন
নৈশব্দের ভারে হয়ে উঠে শব্দহীন।।। 

          

অনভ্যস্ত আত্মকথন ১

ছোটকাল থেকেই আমি বেশ পাকনা বাচ্চা ছিলাম। আব্বুর কাছে শুনেছি যখন আমার বয়স ৩ তখন আম পাতা জোড়া জোড়া টাইপ সব ছড়াই না কি আমার মুখস্ত হয়ে গিয়েছিল! আমি বেশ গোঁ ধরলাম এই বইয়ের ছড়া আর পড়বো না। তখন আব্বু তাঁর একাদশের বই এর প্রিয় দুটি কবিতা আমাকে শিখিয়ে দিয়েছিল।
" একখানি ছোটো খেত, আমি একেলা,
     চারি দিকে বাঁকা জল করিছে খেলা।"
আর 
" এইখানে তোর দাদীর কবর ডালিম গাছের তলে,
তিরিশ বছর ভিজায়ে রেখেছি দুই নয়নের জলে।"
তারপর থেকে কেউ যখন আমাকে জিজ্ঞেস করতো, 'বাবু, একটা ছড়া বলো তো?' আমি না কি এ কবিতা দুটি শুনিয়ে দিতে খুব মজা পেতাম।  

সবচেয়ে প্রিয় উপহার ছিল ফুল আর বই। এ দুটোর প্রতি আমার টান বরাবরের। ফুল সম্পর্কিত একটা ঘটনা স্মরন করতে গিয়ে আম্মুর চোখ এখনো ভিজে যায়। সেবার ঈদের আগের রাত। আমি সিক্স কি সেভেনে পড়ি। আমার জুতা-কাপড় কিছুই কেনা হয়নি। পুরো মার্কেট ঘুরে যখন খালি হাতে বের হলাম তখন রাত ১১টা। কেনো কিনতে পারলাম না আমার ছোট্ট মাথায় তখন সেটা ঢুকে নি। মার্কেটের বাইরে ফুল বিক্রি হচ্ছিল। আব্বু জিজ্ঞেস করলো, নিবি? আমি আগেই দৌড়। ১০টা স্টিক তখন ২০ টাকায় কেনা হয়েছিল। তাই পেয়ে আমি মহাখুশি। নিজে থেকেই নাকি বললাম আমার জুতা, জামা কিচ্ছু লাগবে না। চলো বাসায়। এগুলা দিয়ে সাজাবো। পরে অবশ্য অনেক রাতে অন্য এক জায়গা থেকে কেনা হয়েছিল ওসব।
আর বইয়ের বেলায় বলতে হয় কাগজ পেলেই খুলে পড়ার অভ্যেস ছিল। একারনে ছোটবেলায় একবার ধরা ও খেয়েছি। অন্যের গোপন জিনিস পড়ে ফেলার দায়ে। যদিও তা অনিচ্ছাকৃত ছিল। পড়ার অভ্যেস এত মারাত্মক ছিল যে ফুটপাতের প্রেমের বই থেকে হ্যারি-পটার, শার্লক সবই পড়েছিলাম স্কুল লেভেলেই। সৃষ্টিকর্তা ও আমার প্রতি প্রসন্ন ছিলেন বোধহয়। যে কারনে বহু প্রতিযোগিতা জিতে পেয়েছিলাম অসংখ্য বই।

আমি সমুদ্র দেখতে গিয়েছিলাম দু'বার। সেই সাড়ে চারে আর এই ছাব্বিশে। দু বারেই সমুদ্রের ঢেউ আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিলো। সাড়ে চারে আম্মুর হাত থেকে ছুটে গিয়েছিলাম আর ছাব্বিশে বেখেয়ালে ভেসে গিয়েছিলাম। কে জানে আমার নামের সাথে মিল আছে দেখেই কি না ঢেউ আমাকে এত টানে...

মঙ্গলবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

টুকরো জীবন ৯

কোনো দিন মধ্যদুপুরে হঠাৎ ফোনের রিংটোন
বেজে উঠবে না আর!
'ঔষধ খেয়েছি কি না?'
তা জেনে যাপিত জীবন
কতটুকু আর ভরে!
জীবনের তৃষ্ণা তাই ফুরিয়ে যায়,
ঔষধের তৃষ্ণা বাড়ায়।

পার্কের সেই তালগাছটা এখন
সন্ধ্যার অন্ধকারে আরো বড় দেখা যায়।
সে কি জানে?
কোনও এককালে তার হাওয়ায় ভাসা মানব হৃদয়,
আজ সময়ের বেরহম স্রোতে ভেসে যায়।
এ মানব জনম,
বড় শূন্য হাতে ফিরায়!

শনিবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯

কবিতার প্রহর ২৩

আমি আর আসবো না বলে

আল মাহমুদ


আর আসবো না বলে দুধের ওপরে ভাসা সর
চামোচে নিংড়ে নিয়ে চেয়ে আছি। বাইরে বৃষ্টির ধোঁয়া
যেন সাদা স্বপ্নের চাদর
বিছিয়েছে পৃথিবীতে।
কেন এতো বুক দোলে? আমি আর আসবো না বলে?
courtesy: instagram/urmee_s.a
যদিও কাঁপছে হাত তবু ঠিক অভ্যেসের বশে
লিখছি অসংখ্য নাম চেনাজানা
সমস্ত কিছুর।

প্রতিটি নামের শেষে, আসবো না।
পাখি, আমি আসবো না।
নদী আমি আসবো না।
নারী, আর আসবো না, বোন।
আর আসবো না বলে মিছিলের প্রথম পতাকা
তুলে নিই হাতে।
আর আসবো না বলে
সংগঠিত করে তুলি মানুষের ভিতরে মানুষ।

কথার ভেতরে কথা গেঁথে দেওয়া, কেন?
আসবো না বলেই।
বুকের মধ্যে বুক ধরে রাখা, কেন?
আর আসবো না বলেই।
আজ অতৃপ্তির পাশে বিদায়ের বিষণ্ণ রুমালে
কে তুলে অক্ষর কালো, ‘আসবো না’
সুখ, আমি আসবো না।
দুঃখ, আমি আসবো না।

প্রেম, হে কাম, হে কবিতা আমার
তোমরা কি মাইল পোস্ট না ফেরার পথের ওপর?



মঙ্গলবার, ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯

টুকরো জীবন ৮

একবার হঠাত মাঝরাত্তিরে তুমি ঘুম থেকে জাগিয়ে বলেছিলে,
'আমার তোমায় কিছু দিতে ইচ্ছে করছে!
আছে তোমার কোন চাওয়া?'
জবাবে বলেছিলাম...
Image : Hourglass
Courtesy: Sarah Dickenson
'আমায় একটা বালুঘড়ি দিও।
ঝরে পড়া বালির বুক চিড়ে যে সময় গড়ায়
সেখানে আমি আটকে রাখবো এ মূহুর্তটাকে।"

তারপর এমন কত মাঝরাত্তি গড়ালো !
তুমি হয়তো ভাবতে
ভুলে যাওয়ার আরেক নাম এগিয়ে যাওয়া
তাই ভুলে যাওয়ার আনন্দস্রোত ভাসিয়ে নিলো
বাসি হওয়া সব মূহুর্ত।

মহাকালের অবধারিত বয়ে যাওয়া শেষে,
বালুঘড়ির বুক জুড়ে নিয়েছে এখন শূন্যতা।
পাশ ফিরলেই কী ভীষণ মিথ্যেয় গড়া
আমাদের চারপাশ!
সময়ের আগে তাই ভেঙে গেলো
আমাদের 'ঠুনকো সময়'।

শুক্রবার, ২৬ অক্টোবর, ২০১৮

টুকরো জীবন ৭

যার জন্য ভালোবাসা দিয়ে ভেতরটা পূর্ণ করে রেখেছিলাম,
সে আমার জন্য তার ভেতরে ঘৃণার চাষ করে রেখেছে।
বোকা!
সে কি জানে না?
ঘৃণার পিঠে ঘৃণার জন্ম হয়। তারপর এ ফসল একদিন গ্রাস করবে তার নিজ সত্তাকেই! ছড়িয়ে পড়বে বহুদূর।
লোকজন পাশ কেটে যেতে গিয়ে দেখবে 
আপাদমস্তক ঘৃণা লেখা কেউ নির্বিকার হেঁটে যাচ্ছে।
কেউবা অবাক হয়ে বলবে, "এতটা ঘৃণা ধারণ করাও কি সম্ভব! জীবন টা ত খুব ছোট ছিল।"

ভালোবাসা হলো বাড়ির পাশের ঐ দোলনচাঁপা গাছটার মতো। যার ছোট্ট একতোড়া ও কতটুকু সৌরভ ছড়িয়েছে সে খবর রাখার আগেই সে ঝরে গেছে।
তবু বহুদিন পর লোকে বলবে, এখানটায় একটা গাছ ছিলো। রাতের খোলা জানালায় যার সৌরভ বলেছিল তার কথা।
তাই ভালোবাসায় মোড়ানো কথার খবর না রাখলেও চলে। সে বেঁচে থাকে সৎ মূহুর্তগুলোয়।
               
আর ঘৃণার বিষাক্ত ছায়া,
কুড়ে কুড়ে খায় হৃদয়ের উর্বর জমির
প্রতিটি ইঞ্চি।

শুক্রবার, ২২ জুন, ২০১৮

টুকরো জীবন ৬

- দু:খগুলো যদি ছাপার অক্ষরে হতো!
তবে একটানা পড়ে শেষ করে ফেলা যেতো।
কিন্তু তেমন কালি না কি এখনো হয় নি,
যে দু:খ লেখে।

- আবীর ও বুঝি নেই?
তবে আঁকা যেতো।

- ধুর, বোকা! এর আবার আবীর কী!
দু:খ কি আর রঙিন হয়?
সাদা আর কালোয় মেশানো।

- তবে যে গন্ধ হয়!
কেমন ঝাঁঝালো

- আরে! ও তো স্বপ্ন পোড়া ঘ্রাণ।
চোখে জ্বালা ধরায় না?

- হুঁ, খুব।
রক্তিম চোখে লোনা জলের জোয়ার ডেকে আনে

- এটাই হওয়ার কথা।
এমনি ছিল
যুগ যুগ।
                 দু:খ
সবার লুকানো সমুদ্রের জোয়ারে

শনিবার, ১৬ জুন, ২০১৮

কবিতার প্রহর ২২

কৃষকের ঈদ
কাজী নজরুল ইসলাম

বেলাল! বেলাল! হেলাল উঠেছে পশ্চিম আসমানে,
লুকাইয়া আছ লজ্জায় কোন মরুর গরস্থানে।
হের ঈদগাহে চলিছে কৃষক যেন প্রেত- কংকাল
কশাইখানায় যাইতে দেখেছ শীর্ণ গরুর পাল?
রোজা এফতার করেছে কৃষক অশ্রু- সলিলে হায়,
বেলাল! তোমার কন্ঠে বুঝি গো আজান থামিয়া যায়।
থালা, ঘটি, বাটি বাঁধা দিয়ে হের চলিয়াছে ঈদগাহে,
তীর খাওয়া বুক, ঋণে- বাঁধা- শির, লুটাতে খোদার রাহে।
জীবনে যাদের হররোজ রোজা ক্ষুধায় আসে না নিদ
মুমুর্ষ সেই কৃষকের ঘরে এসেছে কি আজ ঈদ?
একটি বিন্দু দুধ নাহি পেয়ে যে খোকা মরিল তার
উঠেছে ঈদের চাঁদ হয়ে কি সে শিশু- পাঁজরের হাড়?
আসমান- জোড়া কাল কাফনের আবরণ যেন টুটে।
এক ফালি চাঁদ ফুটে আছে, মৃত শিশুর অধর পুটে।
কৃষকের ঈদ! ঈদগাহে চলে জানাজা পড়িতে তার,
যত তকবির শোনে, বুকে তার তত উঠে হাহাকার।
মরিয়াছে খোকা, কন্যা মরিছে, মৃত্যু- বন্যা আসে
এজিদের সেনা ঘুরিছে মক্কা- মসজিদে আশেপাশে।
কোথায় ইমাম? কোন সে খোৎবা পড়িবে আজিকে ঈদে?
চারিদিকে তব মুর্দার লাশ, তারি মাঝে চোখে বিঁধে
জরির পোশাকে শরীর ঢাকিয়া ধণীরা এসেছে সেথা,
এই ঈদগাহে তুমি ইমাম, তুমি কি এদেরই নেতা?
নিঙ্গাড়ি’ কোরান হাদিস ও ফেকাহ, এই মৃতদের মুখে
অমৃত কখনো দিয়াছ কি তুমি? হাত দিয়ে বল বুকে।
নামাজ পড়েছ, পড়েছ কোরান, রোজাও রেখেছ জানি,
হায় তোতাপাখি! শক্তি দিতে কি পেরেছ একটুখানি?
ফল বহিয়াছ, পাওনিক রস, হায় রে ফলের ঝুড়ি,
লক্ষ বছর ঝর্ণায় ডুবে রস পায় নাকো নুড়ি।
আল্লা- তত্ত্ব জেনেছ কি, যিনি সর্বশক্তিমান?
শক্তি পেলো না জীবনে যে জন, সে নহে মুসলমান।
ঈমান! ঈমান! বল রাতদিন, ঈমান কি এত সোজা?
ঈমানদার হইয়া কি কেহ বহে শয়তানি বোঝা?
শোনো মিথ্যুক! এই দুনিয়ায় পুর্ণ যার ঈমান,
শক্তিধর সে টলাইতে পারে ইঙ্গিতে আসমান।
আল্লাহর নাম লইয়াছ শুধু, বোঝনিক আল্লারে।
নিজে যে অন্ধ সে কি অন্যরে আলোকে লইতে পারে?
নিজে যে স্বাধীন হইলনা সে স্বাধীনতা দেবে কাকে?
মধু দেবে সে কি মানুষে, যাহার মধু নাই মৌচাকে?
কোথা সে শক্তি- সিদ্ধ ইমাম, প্রতি পদাঘাতে যার
আবে- জমজম শক্তি- উৎস বাহিরায় অনিবার?
আপনি শক্তি লভেনি যে জন, হায় সে শক্তি-হীন
হয়েছে ইমাম, তাহারি খোৎবা শুনিতেছি নিশিদিন।
দীন কাঙ্গালের ঘরে ঘরে আজ দেবে যে নব তাগিদ
কোথা সে মহা- সাধক আনিবে যে পুন ঈদ?
ছিনিয়া আনিবে আসমান থেকে ঈদের চাঁদের হাসি,
ফুরাবে না কভু যে হাসি জীবনে, কখনো হবে না বাসি।
সমাধির মাঝে গণিতেছি দিন, আসিবেন তিনি কবে?
রোজা এফতার করিব সকলে, সেই দিন ঈদ হবে।

মঙ্গলবার, ৩০ মে, ২০১৭

টুকরো জীবন ৫

pic: www.instagram.com/urmee_s.a/
কী অদ্ভুত সময় কেটেছে, মোহগ্রস্ততার!
ভুল নদীর বাঁকে।

দুরভিসন্ধির খেলায় পরাজিত সত্ত্বা
অতঃপর হেঁটে এসেছে, একরাতে
হাজার বছরের পথ।
এখন মনে হয় ঢের দিন বেঁচে আছি,
স্বার্থপর পৃথিবীর চেয়েও
যেন কিছু বেশী হল আয়ু।

যে ঢেউয়ে চলে গেছে নদী,
মানুষের দূরবিন্দুর বাইরে
এবার ছুটিতে হবো সে ঢেউয়ে বিলীন।

শূণ্যতার হাহাকার নিয়ে, 
ধূসর পৃথিবী বেঁচে থাক,
বেঁচে থাক আরো হাজার বছর।


মঙ্গলবার, ১৮ এপ্রিল, ২০১৭

কবিতার প্রহর ২১

ঝরোকায়

ফররুখ আহমদ


মুসাফির জনতার মৃদুশব্দ নিম্নমুখ নীল পেয়ালায়
মিশে গেল আকাশের স্তব্ধ ঝরোকায়!
সুর্মা পাহাড়ে লুপ্ত অগ্নিবর্ণ গুলরুখ শিখা।

রাত্রি আজ গাঢ় ঘন! মন
দক্ষিণ হাওয়ায় ভেসে মুসাফির উজানী-পবন,
গন্ধ খুঁজে ফেরে।

আকাশেরে করিয়া চৌচির
তার কান্না লুটে পড়ে
উত্তর সাগর তীরে দক্ষিণের সামুদ্রিক ঝড়ে,
সন্ধান করে সে ইতস্তত
নীড় তাঁর শ্রাবণের পাখীদের মত।

গন্ধ আসে দূরান্তর হ'তে।
হে প্রিয়! ভেসেছি আমি দীর্ঘ নওবাহারের ঘন নীল স্রোতে,
তখনি তোমার
ও-সুরভি ভার
স্পর্শ করি গেছে বারে বারে;
প্রখর আতসী স্রোতে ভেসে আমি চাইনি তোমারে।

আজ আমি খুঁজে মরি
পাতায় পাতায়, ঘাসে ঘাসে,
পাই না তোমাকে। শুধু বহু দূ'র হ'তে গন্ধ আসে
ভেসে যায় মাঠ, মন মুহুর্তের রক্তিম প্রশ্বাসে।
পাই না তোমারে।
 ------------------------
মুগ্ধ মন আকুল সৌরভে
নাহি জানি ভুলেছে সে কবে
রজনীগন্ধার স্নিগ্ধ ভীরু বাতায়ন,
রুদ্ধ কারা দ্বার ভাঙি'আজ সে করিছে দূরে কার অন্বেষণ!
নৈশ বাতাসের তীরে
আঁধারের বুক চিরে
নেমে আসে ঘুম।

                               মনে হয় আকাশ কুসুম
                               তোমার সন্ধান।
তবু লাগে জোয়ারের টান,
সুপ্তির অতল যেয়ে হানা দেয় জাগ্রত চেতনা,
কী অসহ্য বেদনায় লাগে বুকে সৌরভ -মূর্ছনা!
বন-চামেলির স্রোতে ভেসে যাই কোথায় সুদূরে
ভারাক্রান্ত তনু ছেড়ে মন আজ ফেরে ঘুরে ঘুরে__
                                             দক্ষিণ বাতাসে
নিজেক হারায়ে ফেলে ছুটে চলে ব্যাকুল আশ্বাসে।
প'ড়ে থাকে ধুলিমুঠি, প'ড়ে থাকে ভ্রান্ত অহংকার__
ব্যথাতুর হ'য়ে ওঠে সমগ্র চেতনা, সত্তা, মনের কিনার।
ধূলিতলে মিশে যায় রজনীগন্ধার- সুঠাম, সুগোল তনুতল,
ফোটায়ে বিশুভ্র দল, ঝরায়ে সুরবি অনর্গল
অরণ্য হেনার ঝড়ে সৌরভ মর্মরে__
                ভুলে যেয়ে আবর্তের টান,
অন্তরের ঘ্রাণ,
পাপড়ির রূপ ছিড়ে খোঁজে সে গভীর মূলে সুরভি বিতান...


(সংক্ষেপিত)

শুক্রবার, ১৪ এপ্রিল, ২০১৭

কবিতার প্রহর ২০

ক্লান্তি

ফররুখ আহমদ


আমার হৃদয় স্তব্ধ, বোবা হ'য়ে আছে বেদনায়
যেমন পদ্মের কু'ড়ি নিরুত্তর থাকে হিমরাতে
যেমন নিঃসঙ্গ পাখী একা আর ফেরেনা বাসাতে;
তেমনি আমার মন মুক্তি আর খোঁজেনা কথায়।
যখন সকল সুর থেমে যায়, তারা-রা হারায়,
নিভে যায় অনুভূতি-- আঘাতে, কঠিন প্রতিঘাতে,
নিস্পন্দ নিঃসাড় হয়ে থাকে পাখী, পায় না পাখাতে
সমুদ্রপারের ঝড় ক্ষিপ্র গতি নিশান্ত হাওয়ায়।

মুখ গুঁজে পড়ে আছে সে পাখীর মত এ হৃদয়
রক্তক্ষরা । ভারগ্রস্ত এ জীবন আজ ফিরে চায়
প্রাণের মূর্ছনা আর নবতর সৃষ্টির বিস্ময়,
উদ্দাম অবাধ গতি, বজ্রবেগ প্রমুক্ত হাওয়ায়;
অথচ এখানে এই মৃত্যু -স্তব্ধ রাত্রির ছায়ায়
রুদ্ধ আবেষ্টনে আজ লুপ্ত হয় সকল সঞ্চয় ।।

 

শনিবার, ৭ জানুয়ারি, ২০১৭

কিছু ছন্নছাড়া সময়ের গল্প ৬

তরঙ্গের ছায়া কি কোথাও পড়ে না!
নাকি অমন স্বচ্ছ বুকের ছায়া হতে নেই?
অন্যেরটা বয়ে বেড়ানোতেই তার স্বার্থকতা?

এই ক্ষণিকের জীবনে পরম পাওয়া বলে তো কিছু নেই,
তাই নাইবা জানলো লোকে
দুখের দীর্ঘ মাস্তুল বুকে
আঘাত করে গেলে
তা কেমন দেখায় দেখতে...

 

শনিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০১৬

কবিতার প্রহর ১৯

বারুদগন্ধী মানুষের দেশে

আল মাহমুদ



শুধু ঝরে পড়া আর মরে যাওয়া ছাড়া অন্য কিছু দেখাও আমাকে
হে বারুদগন্ধী মানচিত্র, কেন এত প্রাণের পিপাসা
চারদিকে চেয়ে দেখি গর্ত শুধু, ডিম রাখা দোয়েলের বাসা
আমার আত্মার ছবি, এই ঝরা আর মরার বিপাকে!
লক্ষ লক্ষ পাখি বুঝি ডিম রেখে উড়ে গেছে দূরে।
দেখি চেয়ে পাতা ঝরে, ফুল ঝরে, ঝরে যায় কুঁড়ি
হাওয়ায় খঞ্জনার গন্ধ লেগে আছে।  অদৃশ্য নূপুরী
সেই পক্ষী ফেরেনি তো নিজ নীড়ে
আমার আত্মায়।
হে বারুদগন্ধী মানচিত্র বন্ধ কর মৃত্যুর তামাশা
বন্ধ হোক ঝরে পড়া,  মরে যাওয়া হাওয়ার ক্রন্দন
এই অন্ধ চোখ দু'টি  হয়ে যাক হেমন্তের খুব ভোরবেলা
তোমার সবুজ থেকে
খুলে ফেল মৃত্যুর মেখলা।

কবিতার প্রহর ১৮

অসমাপ্ত

আল মাহমুদ

 

যতো দেখি, মনে কোন সমাপ্তি জাগে না।
আমার কি আরম্ভ ও ছিলো?
মনে পড়ে ধুলো পায়ে হাঁটা
আর বিশ্রামের ঠাঁইগুলো ছবি হয়ে ভাসে।
চিরকাল পাখি ওড়া
চিরকাল নদী, নৌকা।
তরঙ্গের মাঝখানে ছায়া পড়ে, ছলকায়
দীর্ঘ এক দর্পিত মাস্তুল -
এই আমি। নিরারম্ভ।
অনি:শেষ আত্মার আওয়াজ।

শুক্রবার, ১৪ অক্টোবর, ২০১৬

টুকরো জীবন ৪

শরতের বিকাল গুলো বড্ড পানসে আজকাল।
একঝাক রঙিন ঘুড়ি বুকে নিয়ে স্বপ্নাতুর আকাশের আনত দৃষ্টি,
ক্ষণিকের ব্যবধানেই,
কেমন কাটা ঘুড়ির শুণ্যতা পুষে নিয়ে হারিয়ে যায়  
ঘোলাটে মেঘের আড়ে,
কোন তরঙ্গঢঙে উদ্বেলিত হয়ে নয়!

ভেজা কাকটার গৃহী হওয়ার শখ ছিল,
কিন্তু কোথায় এক আকিঞ্চন স্বপ্নের মৃত্যুতে,
বড় বড় বৃষ্টির ফোঁটারা
খুব করে নাড়িয়ে দিয়ে গেলো
জানালার বা'দিকের ঐ কদম গাছটা।

তার পরের গল্পের খোঁজ আর কেউ রাখে না,
গড়িয়ে যাওয়া দিন-রাতে তো আর কোন ব্যত্যয় ঘটে না।
অগুনতি রাতের হাল ভেঙে,
হৃদয়ের কাঠঠোকরা রা যে নোড়ায় জোয়ার এনেছিল,
সেখানে এখন ভাটির টান।

সে টান বড় শক্ত, মায়াহীন।
রাখেনি বালুকাবেলায় নিঃসঙ্গ গাঙচিলের শেষ পদচিহ্ন টুকুও...


 


শুক্রবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬

কিছু ছন্নছাড়া সময়ের গল্প ৫

courtesy: pexels.com
মাঝে মাঝে ইচ্ছে হয়                            
আমিও হই,
উড়ে যাওয়া বকের দুধসাদা পাখার মতোন।

বদ্ধতার আগল ছিঁড়ে
পতিত মনের বেড়ে উঠা আগাছার ভিড়ে।

আমারও হউক,
ক্লান্তিহীন দু'চোখ।
খুঁজে ফেরে সর্বস্ব নিমিষে ভাসায়
দূর সমুদ্রের বুকে,
নতুন চরের আশায়।

পৃথিবীর পঙ্কিল মন
যার পায়নি ছোঁয়া...