মঙ্গলবার, ৩০ ডিসেম্বর, ২০১৪

অদেখা নথি


স্বপ্নাবিষ্ট অবস্থা থেকে জেগে উঠার আগমুহূর্তে নিজেকে আবিষ্কার করলাম অদ্ভুত এক কক্ষে। দেয়ালের একপাশের তাক পূর্ণ হয়ে আছে ছোট ছোট কার্ড ভর্তি অসংখ্য ফাইলে। এ ছাড়া রুমটির আর বিশেষ কোন বৈশিষ্ট্য চোখে পড়ল না। লাইব্রেরীর কার্ডগুলো যেমন লেখক বা বিষয়ের নামের বর্ণানুক্রম অনুসারে সাজানো থাকে এ কার্ডগুলো ও তেমনিভাবে সাজানো ছিল। কিন্তু, মেঝে থেকে সিলিং পর্যন্ত বিস্তৃত অগণিত এ ফাইলগুলো ছিল একটু ভিন্ন শিরোনামে! দেয়ালের দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় প্রথম যে ফাইলটি আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে তা ছিল যাদের আমি পছন্দ করতামএটি খুলে আমি কার্ডগুলোর ওপর চোখ বুলাতে লাগলাম। তৎক্ষণাৎ এটি বন্ধ করে দিলাম যখন ভয়ের সাথে লক্ষ্য করলাম যে কার্ডের ওপর লেখা প্রত্যেকটি নামই আমার পরিচিত। আর তখন কোনরূপ বলে দেয়া ছাড়াই বুঝতে পারলাম যে, প্রকৃতপক্ষে আমি কোথায়? প্রাণহীন এই কক্ষের অসংখ্য ছোট খোপে সাজানো আমারই কৃতকর্মের নথি। প্রতিটি মুহুর্তের কাজ হউক তা ছোট কিংবা বড় সবই এখানে বিস্তারিতভাবে লিপিবদ্ধ। আমার স্মৃতি যেন আমার নিজের সাথেই বিশ্বাসঘাতকতা করলো। প্রবল আগ্রহ আর ভয়ের মিশ্র এক অনুভূতি আমায় জেঁকে ধরলো যখন আমি একটার পর একটা কাগজ খুলছিলাম। কিছু স্মৃতি ছিল সত্যিই সুখের, কিন্তু বেশীরভাগই এত লজ্জা আর পরিতাপের যে আমি বারবার ঘাড় বাঁকিয়ে দেখছিলাম কেউ আসছে কি না?

বন্ধু শিরোনামের একটি ফাইলের দিকে চোখ গেলো যার পাশেই পড়ে ছিলো বন্ধু, যাদের আমি ঠকিয়েছি নামের আর একটি ফাইল। শিরোনামগুলোর বিষয়বস্তু পার্থিব ছোটখাট ব্যাপার থেকে শুরু করে অপার্থিব ভয়, চিন্তা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। আমার পড়া যত বই, যত মিথ্যা আমি বলেছি, যেসব নিয়ামত আমি ভোগ করেছি, কৌতুক, বিদ্রুপ যা নিয়ে আমি হেসেছিপ্রত্যেকটি বিষয়ই এতো নিখুঁত ছিল যে, কিছু কিছু লেখার যথার্থতায় এতো কষ্টের মাঝেও আমার হাসি পাচ্ছিলো; ছোট বোনকে কী বলেছিকিন্তু আমি সত্যিই হাসতে পারছিলাম না যখন দেখছিলাম রাগের মাথায় আমি কী করেছি, বাবা- মার কথায় মনে মনে যা বিড়বিড় করেছিএগুলো আমার বিস্ময় বাড়িয়ে তুলছিলো। অনেকক্ষেত্রেই তা ছিল প্রত্যাশার চেয়েও বেশি। আবার অনেক সময় কম। আমি অবাক বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করলাম আমার পঁচিশ বছরের জীবনে এত হাজার হাজার এমনকি লক্ষ লক্ষ কার্ড লেখা কি করে সম্ভব হল! অথচ এর প্রত্যেকটিতেই আমার স্বাক্ষরসম্বলিত হাতের লেখা।
   
ছবি কৃতজ্ঞতা : গুগল


আমার শোনা যত গানএই শিরোনামের ফাইলটি যখন আমি হাতে নিলাম তখন সত্যিই এর ওজন দেখে শঙ্কিত বোধ করলাম। অসংখ্য কার্ড দিয়ে পূর্ণ কয়েক ফুট প্রস্থের এই ফাইলটির আমি যেন কোন কিনারা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। সীমাহীন লজ্জায় আমি ফাইলটি বন্ধ করে দিলাম শুধুমাত্র যে গানের মান দেখে তা নয় বরং জীবনের কতটা সময় আমি গান শুনে ব্যয় করেছি তা ভেবে।
এর পরের ফাইলটা দেখে আমার মেরুদণ্ডের ভেতর দিয়ে একটা শীতল স্রোত বয়ে গেলো। 'আমার যত অশ্লীল চিন্তা' শিরোনামের এই নথিটির সাইজ পরিমাপের কোন ইচ্ছাই আমার ছিলো না। ইঞ্চিখানেক ফাঁক করার পর যে কার্ডটা আমার হাতে এসে পড়লো আমার ভীতবিহবল শূন্য দৃষ্টি তাতে হারিয়ে গেলো। ভেতরটা কেমন যেন হাহাকার করে উঠলো। এরকম একটা তুচ্ছ মুহুর্তের কথাও এখানে সংরক্ষিত আছে? হঠাত পাশবিক উন্মত্ততা আমায় পেয়ে বসলো। একটাই চিন্তা আমার মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগলো।
নাহ! এই কার্ডগুলো কেউ কখনো দেখতে পাবে না, এমনকি অদ্ভুত এই রুমের হদিসও যেন কেউ না পায়। এর সবই আমাকে ধ্বংস করতে হবে।
একটা পাগলাটে অবস্থার মধ্যে আমি ফাইলগুলো টেনে বের করতে লাগলাম। এগুলোর আয়তন এখন আর আমার কাছে কোন ব্যাপারই মনে হল না। আমাকে পুড়ে ফেলতে হবে এসব নথি। কিন্তু যখনই আমি এগুলো টেনে মাটিতে ফেলতে চাইলাম, আমি ব্যর্থ হলাম। মরিয়া হয়ে অবশেষে কার্ডগুলো ছিঁড়ে ফেলার সিদ্ধান্ত নিলাম। কিন্তু, হায়! এগুলোকে মনে হলো ষ্টীলের চেয়েও শক্ত। 
অসহায় আর পরাজিত আমি একটা সময় সব আশা ছেড়ে দিলাম। দেয়ালে যখন পিঠ এসে ঠেকলো তখন আমার দীর্ঘশ্বাসে বাতাস ভারী হয়ে আসছিলো। হঠাত আমি এটা দেখলাম। 'ইসলামের আলো পৌঁছেছিলাম যাদের কাছে' এই শিরোনামের একটি ফাইল যার প্রচ্ছদটি প্রায় নতুন। দেখে মনে হচ্ছে এর ব্যবহার খুব একটা হয়নি। এটা খোলার পর যে অল্প কয়েকটা কার্ড এসে আমার হাতে পড়লো তার সংখ্যা আমি সহজেই গুনতে পারলাম।
বুক ফেটে আমার কান্না বেরিয়ে আসতে চাইল। কী করুণ আর্তি সে কান্নার! আমার অশ্রুপূর্ন দু'চোখের সামনে শুধু ফাইলভর্তি তাকগুলো ভাসছিলো। আর অসহায় হৃদয়ের আর্তি ছাপিয়ে উঠলো সবকিছুকেই

'হায়! সত্যিই যদি আমার জীবনে এসব না থাকতো,
 হায়! সত্যিই যদি আমার জীবনে এসব না থাকতো!' 

"আমি মৃতকে করি জীবিত এবং লিখে রাখি যা তারা অগ্রে প্রেরণ করে এবং যা তারা পশ্চাতে রেখে যায়।" 

হে নাবী! তুমি বলে দাও : তোমরা কাজ করতে থাক, অনন্তর তোমাদের কার্যকে অচিরেই দেখে নিবেন আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও ঈমানদারগণ; আর নিশ্চয় তোমাদেরকে প্রত্যাবর্তিত হতে হবে এমন এক সত্তার নিকট যিনি হচ্ছেন সকল অদৃশ্য ও প্রকাশ্য বিষয়ের জ্ঞাতা, অতঃপর তিনি তোমাদেরকে তোমাদের সকল কৃতকর্ম জানিয়ে দেবেন।
 

পাদটীকা :
গল্পটি Islamic stories নামের একটি অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ থেকে অনূদিত।
[১] আল কুর'আন ৩৬ : ১২
[২] আল কুর'আন ৯ : ১০৫ 

শুক্রবার, ৩১ অক্টোবর, ২০১৪

কবিতার প্রহর ১২

প্রহরান্তের পাশ ফেরা

আল মাহমুদ


আমি নৈঃশব্দের জন্যে অপেক্ষা করতে করতে বালিশের ওপর
কাত হয়ে এ শহরের সর্বশেষ নিভু নিভু শব্দের মিলিয়ে যাওয়া
তরঙ্গ রক্তের ভেতর অনুভব করি। এমনকি শব্দের
ফেটে যাওয়া বুদবুদগুলিও বুঝি আমার কর্ণকুহরে
প্রবেশ করে। স্নায়ুতন্ত্রীতে বেজে উঠে ঢাকা শহরের
প্রতিটি প্রহরান্তের পাশ ফেরা। একটা বিনিদ্র পাগলের
পেছনে খেঁকিয়ে ডাকছে একপাল কুকুর। আর চির
জাগরূক রাজনীতি পোস্টার সেঁটে দিচ্ছে আগামী হরতালের।
নৈঃশব্দের জন্য অপেক্ষা মানে তো অভ্যস্ত আওয়াজ থেকে,
দিনের ঘড় ঘড় থেকে রাত্রির শিসের জন্য বসে থাকা।
দিনের কোলাহল তো মানুষের শরীরের মতো।
অনবরত শব্দের হাত পা নড়ছে। যেমন সকাল বেলা
মিহি শব্দে কসাইরা মাংসের চাঙড় ফালা ফালা করে ফেলে
আর আমাদের কানে বাজে মাংস ও লোহার সম্মিলিত আর্তরব।
কে কাকে কাটছে? রক্তের ফোঁটারা আমিষলোভী আমার নামে
কী যেন নালিশ করতে থাকে। নালিশ করছে কাকে?

এই তো আমার পাশেই পালঙ্কে একটি নালিশহীন মুখ ঘুমিয়ে।
এই ঘুমন্ত নারীর মুখের সাথে আমি কার তুলনা দেবো?
উপমার সব উপাদানকে তুচ্ছ করে তার নিঃশ্বাস পড়ছে।
কাঁপছে বুক। ভ্রু রেখা কুঞ্চিত হচ্ছে। তার নাকফুলে কে
উৎকীর্ণ করে দিয়েছে একটি ঘাসফুল। যে অতীত রাজ্য
থেকে সে এ শহরে বাস করতে এসেছে এ অলংকার বিন্দুটি
সেই শিশিরভেজা প্রান্তরেরই টলটলায়মান অশ্রুজল।
যা কোনদিন শুকাবে না।
এই শহরের কত খররৌদ্রকে এই মুখ শোষণ করে নিয়েছে।
গ্যাসের নীলাভ শিখা লেহন করেছে তার সর্বাঙ্গ। নিজেকে
বিদীর্ণ করে সে পৃথিবীকে দিয়েছে শিশুর কলরব।
আর পর্দার ফাঁক দিয়ে দুটি কালো চোখ মেলে দেখেছে
টেবিলে উপুড় হয়ে পড়া এক ধ্বণির বিদ্যুৎ। কবিতার
জন্মরীতির সাক্ষ্য দিতে কেউ তাকে ডাকবে না জেনেও
কী তৃপ্তি নিয়ে সে ঘুমাতে পারে। আমিতো পারি না!
আমি ততক্ষণ তাকে পাহারা দেবো যতক্ষণ আমার
গর্দানের মূল শিরার কাছে থেকে আমার প্রভু আমার
প্রার্থনার জবাব দেবেন। কারণ আমি জানি
শতাব্দীর এই শেষ পাদে
প্রেম শব্দটিকে বে-আব্রু করতে যারা টেবিল চাপড়াচ্ছে
তাদের আগ্নেয়াস্ত্রের সামনে দাঁড়াতে পারে এমন
দল বা প্রতিরোধ বাহিনী নেই। নেই
সে যৌবন যে লুণ্ঠন ও লোভের বশবর্তী নয়। নেই সেই
শিক্ষক, যিনি সৌন্দর্যের পক্ষে দাঁড়িয়ে
অন্তত একবার বিদ্রুপে বিদ্ধ হবেন।

আজ বারবার মনে পড়ছে আমি তো অস্ত্র চালনা জানতাম।
লক্ষ্যভেদ জানতাম। ঘৃণা ও ঈর্ষার আগুনে
বয়োজ্যেষ্টরা আমার হাত সেঁকে শক্ত করে দিয়েছিলেন।
মসজিদের মিনারগুলো আমাকে শিখিয়েছিলো দৃঢ়তা
আমি কেন তবে নৈঃশব্দের জন্য রাত জেগে
পৃথিবী পাহারা দেবো?
না, আক্রমণ করো প্রেমের শত্রুদের
নালিশহীন মুখের শত্রুদের।
দ্যাখো, ঐ নাকফুলটির ওপর ঘামের বিন্দুগুলো
একটি রেখা হয়ে নামছে
যেন একটি উপত্যকা বেয়ে এই মাত্র নেমে এল নদী।
আমি তার মুখের ওপর স্রোতস্বিনী জলের জানু অবলোকন করি।
আর ভাবি আমি পৃথিবীতে এসেছি সৌন্দর্যের
দেনা শোধ করবো বলে।
পৃথিবীর সমস্ত অস্ত্রবিদ্যার কসম,
কুৎসিতের জানুসন্ধিতে কুৎসাভেদী বারুদকে আমি
প্রজ্বলিত করবো।
আমার শব্দ অতিক্রম করবে তাদের হৃদপিণ্ড,
আমার উপমা উৎপাটন করবে তাদের ঈগলচক্ষু বিদ্বেষ,
তাদের কবরের মতো নাস্তিক্যের নিস্তব্ধতায় আমি বইয়ে দেব
প্রার্থনার ঘূর্নিঝড়।
আমার নিঃশ্বাসে সবুজ হয়ে উঠবে বাংলাদেশের প্রান্তর
পৃথিবীর শস্যক্ষেত্র।

কবিতাটার আবৃত্তি শুনছিলাম সাইমুম এ। আর আমিও যেনো রক্তের ভেতর অনুভব করছিলাম শহরের সর্বশেষ নিভু নিভু শব্দের মিলিয়ে যাওয়া তরঙ্গ।

ছবি কার্টেসী : গুগল 


সোমবার, ২৭ অক্টোবর, ২০১৪

কড়া নেড়ে গেছি ভুল দরজায়

ছবি : গুগল
ছেলেটার একটানা চিৎকার অসহ্য ঠেকছিলো। একে তো লং জার্নি, তার উপর অপরিচিত এক জায়গায় এসে উঠেছি। সবচেয়ে বড় কথা দোতলার যে বাসাটায় আমরা উঠেছি তার ব্যালকনিতেই যেতে পারছি না। একটু দূরেই নিচে দাঁড়িয়ে রয়েছে সে। ৭-৮ বছরের একটা ছেলে অথচ গায়ে কোন কাপড়ই নেই। 
শেষমেশ বিরক্ত হয়ে আমার যে আত্মীয়ের বাসায় উঠেছি ওনাকে জিজ্ঞেসই করে ফেললাম। 'ছেলেটা কখন থেকে এভাবে দাঁড়িয়ে চিৎকার করছে! কেউ কিছু বলছে না কেন?' উনি বললেন, 'বলার মত কেউ নেই। ছেলেটা প্রতিবন্ধী। কথা বলতে পারে না। তাছাড়া গায়ে কাপড়ও রাখে না। আর সে ওখানে ইচ্ছে করে দাঁড়িয়ে আছে কই! তার মা সকালে গার্মেন্টস কারখানার কাজে যাওয়ার আগে তাকে ঐ খুঁটির সাথে তালা মেরে রেখে গেছে। সন্ধ্যায় ফিরে এলে তালা খুলে তাকে ভেতরে নিয়ে যাবে। জন্মের দু'বছর পরই ওর বাবা ওদের ফেলে রেখে চলে যায়। তারপর থেকে ওর মা ওকে এভাবেই বড় করছে।'
মুহুর্তের জন্য কোন কথা সরল না আমার মুখ থেকে। তারপর যে দু'দিন ছিলাম নিজের কাজ ছাড়া বাকীটা সময় ব্যালকনিতেই দাঁড়িয়ে থাকতাম। চারধারে দেয়ালের প্রাচীর। মাঝখানে ছোট ছোট তিনটা টিনের ঘর। এরই একটাতে ওরা থাকে। সকালে যাওয়ার আগে তার মা তাকে পরিষ্কার একটা কাপড় পরিয়ে দেয় (যদিও কিছুসময় পরেই সে তা খুলে ফেলে)। তারপর দেয়ালের এককোণের একটা কাঠের খুঁটির সাথে তাকে বেঁধে রেখে যায়। এক হাত লম্বা একটা শিকল। এটুকুই তার বিচরণক্ষেত্র। সাথে থাকে সস্তা কিছু চকোলেট।
সারাদিন সে অদ্ভুতভাবে চিৎকার করে। হয়তবা তার অব্যক্ত কথাগুলোই ফুটিয়ে চলে প্রাণপণে। এর মাঝে একবার শুরু হল ঝুম বৃষ্টি। বৃষ্টির সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ছেলেটার চিৎকার। অনেকক্ষণ পর পাশের ঘর থেকে একজন মহিলা বের হয়ে তালা খুলে দিল। বৃষ্টি থামতেই আবার সেই বদ্ধতা।

এর মাঝে কিছু ব্যাপার লক্ষ্য করে অবাক হলাম। দেয়ালের গায়েই একটা ছোট ছিদ্র আছে যেটা তার জানা। একটু দূরেই রেললাইন হওয়ায় বেশ কয়েকটা ট্রেন যায় ঐ রাস্তা দিয়ে। ট্রেনের আওয়াজ শুনলেই ছেলেটা উঠে সেই ছিদ্রে চোখ রাখে। যতক্ষণ ট্রেনটা যায় হারিয়ে যাওয়ার এক আনন্দ যেন তার চোখে-মুখে ফুটে উঠে।
তবে সবচেয়ে আনন্দের সময়টা হচ্ছে বিকেলবেলা যখন দেয়ালের ওপাশের খালি জায়গায় তার বয়সী কয়েকটা ছেলে ক্রিকেট খেলতে আসে। প্রাচীরের ছিদ্র দিয়ে সারাটা খেলাই সে যে মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুধু দেখে তা না বরং হাত পা ছুঁড়ে সেও যেন সক্রিয় অংশগ্রহণ করে। প্রাচীরের ভেতরের এ খেলার নীরব দর্শক আমি। ছোট্ট এক ছিদ্রে সে যেন তার জীবনের সব রঙ খুঁজে পেয়েছে।
সন্ধ্যার পর তার মা আসলে সে ফিরে যায় প্রশান্তির নীড়ে।

ক্ষুদ্র এ জীবনে হতাশার কোন শেষ নেই। তুচ্ছ কারণেও অভিযোগের পাহাড় গড়ে উঠে। জীবনের রঙ খুঁজতে যতই দ্বারস্থ হই সাহিত্য, বিজ্ঞান কিংবা সংগীতের, আত্মার প্রকৃত প্রশান্তি থেকে ততই যেন দূরে সরে যাই। তাইত প্রাচীরের অসংখ্য ছিদ্রেও কখনো রঙিন জীবন ধরা পড়েনি। কারণ অগণিত নিয়ামত ভোগ করার পরও সে চোখ কৃতজ্ঞতার বর্ষণে সিক্ত হতে শেখেনি...   

বুধবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

কবিতার প্রহর ১১

এক আল্লাহ জিন্দাবাদ

কাজী নজরুল ইসলাম


উহারা প্রচার করুক হিংসা বিদ্বেষ আর নিন্দাবাদ;
আমরা বলিব সাম্য শান্তি এক আল্লাহ জিন্দাবাদ।
উহারা চাহুক সংকীর্ণতা, পায়রার খোপ, ডোবার ক্লেদ,
আমরা চাহিব উদার আকাশ, নিত্য আলোক, প্রেম অভেদ।

উহারা চাহুক দাসের জীবন, আমরা শহীদি দরজা চাই;
নিত্য মৃত্যু-ভীত ওরা, মোরা মৃত্যু কোথায় খুঁজে বেড়াই!
ওরা মরিবেনা, যুদ্ব বাধিঁলে ওরা লুকাইবে কচুবনে,
দন্তনখরহীন ওরা তবু কোলাহল করে অঙ্গনে।

ওরা নির্জীব; জিব নাড়ে তবু শুধূ স্বার্থ ও লোভবশে,
ওরা জিন, প্রেত, যজ্ঞ, উহারা লালসার পাঁকে মুখ ঘষে।
মোরা বাংলার নব যৌবন, মৃত্যুর সাথে সন্তরী,
উহাদের ভাবি মাছি পিপীলিকা, মারি না ক তাই দয়া করি।

মানুষের অনাগত কল্যাণে উহারা চির অবিশ্বাসী,
অবিশ্বাসীরাই শয়তানী-চেলা ভ্রান্ত-দ্রষ্টা ভুল-ভাষী।
ওরা বলে, হবে নাস্তিক সব মানুষ, করিবে হানাহানি।
মোরা বলি, হবে আস্তিক, হবে আল্লাহ মানুষে জানাজানি।

উহারা চাহুক অশান্তি; মোরা চাহিব ক্ষমাও প্রেম তাহার,
ভূতেরা চাহুক গোর ও শশ্মান, আমরা চাহিব গুলবাহার!
আজি পশ্চিম পৃথিবীতে তাঁর ভীষণ শাস্তি হেরি মানব
ফিরিবে ভোগের পথ ভয়ে, চাহিবে শান্তি কাম্য সব।

হুতুম প্যাঁচারা কহিছে কোটরে, হইবেনা আর সূর্যোদয়,
কাকে আর তাকে ঠোকরাইবেনা, হোক তার নখ চষ্ণু ক্ষয়।
বিশ্বাসী কভু বলেনা এ কথা, তারা আলো চায়, চাহে জ্যোতি;
তারা চাহে না ক এই উৎপীড়ন এই অশান্তি দূর্গতি।

তারা বলে, যদি প্রার্থনা মোরা করি তাঁর কাছে এক সাথে,
নিত্য ঈদের আনন্দ তিনি দিবেন ধুলির দুনিয়াতে।
সাত আসমান হতে তারা সাত-রঙা রামধনু আনিতে চায়,
আল্লা নিত্য মহাদানী প্রভূ, যে যাহা চায়, সে তাহা পায়।

যারা অশান্তি দুর্গতি চাহে, তারা তাই পাবে, দেখো রে ভাই,
উহারা চলুক উহাদের পথে, আমাদের পথে আমরা যাই।
ওরা চাহে রাক্ষসের রাজ্য, মোরা আল্লার রাজ্য চাই,
দ্বন্দ্ব-বিহীন আনন্দ-লীলা এই পৃথিবীতে হবে সদাই।

মোদের অভাব রবে না কিছুই, নিত্যপূর্ণ প্রভূ মোদের,
শকুন শিবার মত কাড়াকাড়ি করে শবে লয়ে-- শখ ওদের!
আল্লা রক্ষা করুন মোদেরে, ও পথে যেন না যাই কভূ,
নিত্য পরম-সুন্দর এক আল্লাহ্ আমাদের প্রভূ।

পৃথিবীতে যত মন্দ আছে তা ভালো হোক, ভালো হোক ভালো,
এই বিদ্বেষ-আঁধার দুনিয়া তাঁর প্রেমে আলো হোক, আলো।
সব মালিন্য দূর হয়ে যাক সব মানুষের মন হতে,
তাঁহার আলোক প্রতিভাত হোক এই ঘরে ঘরে পথে পথে।

দাঙ্গা বাঁধায়ে লুট করে যারা, তার লোভী, তারা গুন্ডাদল
তারা দেখিবেনা আল্লাহর পথ চিরনির্ভয় সুনির্মল।
ওরা নিশিদিন মন্দ চায়, ওরা নিশিদিন দ্বন্দ চায়,
ভূতেরা শ্রীহীন ছন্দ চায়, গলিত শবের গন্ধ চায়!

তাড়াবে এদের দেশ হতে মেরে আল্লার অনাগত সেনা,
এরাই বৈশ্য, ফসল শৈস্য লুটে খায়, এরা চির চেনা।
ওরা মাকড়সা, ওদের ঘরের ঘেরোয়াতে কভু যেয়ো না কেউ,
পর ঘরে থাকে জাল পেতে, ওরা দেখেনি প্রাণের সাগর ঢেউ।

বিশ্বাস করো এক আল্লাতে প্রতি নিঃশ্বাসে দিনে রাতে,
হবে দুলদুল - আসওয়ার পাবে আল্লার তলোয়ার হাতে।
আলস্য আর জড়তায় যারা ঘুমাইতে চাহে রাত্রিদিন,
তাহারা চাহে না চাঁদ ও সূর্য্য, তারা জড় জীব গ্লানি-মলিন।

নিত্য সজীব যৌবন যার, এস এস সেই নৌ-জোয়ান
সর্ব-ক্লৈব্য করিয়াছে দূর তোমাদেরই চির আত্বদান!
ওরা কাদা ছুড়ে বাঁধা দেবে ভাবে - ওদের অস্ত্র নিন্দাবাদ,
মোরা ফুল ছড়ে মারিব ওদের, বলিব - "এক আল্লাহ জিন্দাবাদ"।


সোমবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

বাতিঘর

কখনো ভরা আষাঢ়ের মধ্যাহ্নে
থমকে যাওয়া ঘড়ির কাঁটায়
হেঁটে আসি নিকট অতীতের অজানা সেই বালুকাবেলায়।
ঘনিয়ে আসে অন্ধকার,  
নীড়ে ফিরে গেছে দু’টো সারস।
কি দুর্বিষহ আঁধার এক,
আছড়ে পড়ে অব্যক্ত যন্ত্রণার শব্দ বুকে নিয়ে। 

মাঝ সমুদ্রে একটানা বেজে চলছে একটা সাইরেন।
চাপা পড়ে গেছে,   
গর্জনরত তরঙ্গের উদ্বাহু নৃত্যের কাছে
বুঝিবা কোন বন্দী পশুর ক্রোধ,
সুযোগ পেলেই ছিঁড়ে ফেলবে গোটা পৃথিবী।
পল পল করে পেরিয়ে যাচ্ছে সময়,
সম্মুখেই সে তরঙ্গের শীতল হাতছানি,
মনে হয় ধ্বংস অতি নিকটেই।
স্থির চোখ, পলকহীন, আর বয়ে চলা স্রোত সময়ের

কিন্তু না, হঠাৎ থেমে গেছে সাইরেন।
কার্টেসী : google
ঠাণ্ডা স্পর্শ বুকে নিয়ে লজ্জাবনত রাঙামুখো এ সূর্যকে
আমি যেন প্রথম দেখলাম।
শান্ত সমুদ্রের মায়াময় উষ্ণতা বয়ে নিয়ে যাওয়া সেই সিক্ত বাতাস,
বলে গেল চুপিচুপি,
এগিয়ে যাও, সামনে আরেকটু পথ।
তারপরেই সে বাতিঘর,
যে বাতিঘর কখনো নেভে না।।।
 

শনিবার, ৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

কবিতার প্রহর ১০

প্রার্থনার  ভাষা

আল মাহমুদ


মানুষের নভোযান, খেয়া আর প্রযুক্তি তাড়িত বিশাল যান্ত্রিক উৎক্ষেপ
সবি নিরর্থক স্বপ্নের জ্বালানিতে ব্যর্থতার সমুদ্রে সাঁতার মাত্র।
আমি চাই অন্য কিছু
আমার গতি তুমি তো জানো প্রভু কোন দিকে ধাবমান।
আমার রক্ত-মাংসে সেই ফেলে আসা চুম্বকের টান।
যেখান থেকে আমাদের পিতা-মাতা
কেবল জ্ঞানের লোভে, অমরতা ও আত্মতৃপ্তির আকাঙ্ক্ষায়
একদা কানাকড়ির মূল্যে হারিয়ে ছিলেন বেহেশত। সেই
মহাউদ্যানের টান আমার রক্তে, আমার মাংসে ও মজ্জায়।
দাও তাকে ফিরিয়ে আমায়।
প্রার্থনার ভাষা দাও প্রভু, নির্জ্ঞান আত্মসমর্পনের সহজতা।
আমি কি পাড়ি দিয়ে যাচ্ছি না হাঙরকুল সমুদ্রের চেয়ে দুরূহ
যে আয়ু?
সেই দিন এবং রাত্রি?
উদয় আর অস্ত।
আঁধার আর আলো। না
আলো আর অন্ধকার আর নয়। জ্বলুক তোমার নূরের দীপ্তি
যা ভেদ করে যায় পৃথিবীর উদরে লুকানো সমস্ত গলিত ধাতুর
                                                  সাতপরত পর্দা।
পৌঁছুতে চাই প্রভু তোমার সান্নিধ্যে
তোমার সিংহাসনের নীচে  একটি ফুরফুরে প্রজাপতি হয়ে।
যার পাখায় আঁকা অনাদিকালের অনন্ত রহস্য।