সোমবার, ২৮ ডিসেম্বর, ২০১৫

অনিবার্য যাত্রার প্রাক্কালে

সুউচ্চ চূড়া থেকে অতল গহ্বরে
দিকভ্রান্ত আলোহীন বদ্ধ পাঁজরে,
কেবল পতনের শব্দ শুনি
নিকটেই খসে পড়া নক্ষত্রের মতোন।
তবু জমাটবদ্ধ মুহূর্তদের অবিরাম গলে যাওয়া,
শেষ টুকরার অপেক্ষায়।    
জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি সমাপ্তি শুধু
কিছু পথের,
কিছু বখে যাওয়া দিন
আর স্মৃতি হয়ে থাকা কিছু নিউরনের।
অনন্ত ব্যাপ্ত সে পথের তরে
বড় তুচ্ছ এ রসদ।



বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর, ২০১৫

কবিতার প্রহর ১৭

নিশান- বরদার

ফররুখ আহমদ


দিন রাত্রির বোঝা হ'ল আজ দুঃসহ গুরুভার,
স্খলিত পথীর আয়োজন চলে পশ্চাৎ যাত্রার,
চারদিকে বন মরণ শর্তে জীবনের অধিকার_
এখানে তোমার নিশান ওড়াও হে নিশান বরদার!

তোমার নিশান উড়ছে কোথায় নির্জন প্রান্তরে,
জনারণ্যের এখানে শুণ্য শাখা,
নীড় ছেড়ে তার স্বপ্নের পাখী বহুদিন পলাতকা 
জরাস্থবির তার সুদূরের পাখা
মাটিতে গুমরি মরে_
ভেঙে পড়ে বার বার
হে নিশান বরদার!

চারদিকে কারা ফেলে বিষাক্ত শ্বাস,
কারা বয়ে আনে করোটিতে মৃতাসব,
শবের মিছিলে ভিড় ক'রে আসে শব;
মুখ বয়ে আনে চরম সর্বনাশ।

সে পাশবতার আজ উদ্যত ফণা
বিষাক্ত করে সুদূর সম্ভাবনা,
ভেঙে পড়ে তার পুচ্ছ আঘাতে স্বপ্নের চারাগাছ,
লাত মানাতের সঙ্গে নাচে পিশাচ
আধো জীবন্ত তনু;
রং চটা তার আকাশে কখন নিভেছে বর্ন ধনু।

সে সিদরাতুল- মুনতাহার 
পথ ভোলা বুলবুলি,
প্রতি মুহুর্তে আবিল করে সে
এই ধরণীর ধুলি,
ম্লান জুলমাতে আজ সে বিবর গড়ি'
দীপ্ত দিনেরে ক'রেছে কখন বিষাদ শর্বরী।
তার কণ্ঠের বীভৎস চীৎকারে_
কেঁপে উঠে বারে বারে
উষর মাটির বক্ষে অনুর্বর
দুঃস্বপ্নের ঘর।

শঙ্কিত তার দিনের আকাশ,
বিভীষিকা ভরা ঘুম,
ছিন্ন ডেরার দু'য়ারে আঘাত
হানে মরু সাইমুম,
তার কলিজার রক্তে রঙিন গড়ে উঠে ইমারত,
তার কঙ্কাল বিছায়ে জালিম মাপে মিনারের পথ;
পথে পথে আজ শোনো তার হাহাকার
হে নিশান বরদার!

এখানে তোমার নিশান ওড়াও, নিশান ওড়াও বীর,
এখানে শুধুই আবছায়া রাত্রির
তিমির নিবিড়তর,
এখানে তোমার সূর্য প্রকাশ করো।
জনারণ্যের শাখায় শাখায় জাগে প্রাণ- ব্যাকুলতা
আনো আনো তার বিপুল তৃষার দুকূলে উচ্ছলতা
সমুদ্র স্রোতোধার;
হে নিশান বরদার।।

~ ঈষৎ সংক্ষেপিত 

রবিবার, ২৬ জুলাই, ২০১৫

টুকরো জীবন ৩

এইতো সেদিন,
কাকভেজা খুব বৃষ্টি হলে
ছুটে যেতাম কদমতলে।
নুয়ে পড়া সবক'টা ফুল
এই বুঝি পাই হাত বাড়ালে।
ইচ্ছেগুলো অব্যক্ত রয়
হারিয়ে যায় কোন অতলে।
জল ছুঁয়ে যায় নোনা জলে।

ফিরে যেতাম ছোট্ট নীড়ে,
সিক্ত বিকেল শান্ত হলে
থাক না জীবন, এই ক'টা দিন
কাটিয়ে দেই হাসির ছলে।

 

টুকরো জীবন ২

নিশ্চুপ ফুটপাতে
হেঁটে চলা চুপচাপ,
চঞ্চল বৃষ্টিরা
ঝরছে যে টুপটাপ।

ঐ দূর জানালায়
স্বপ্ন কেউ এঁকে যায়,
এথা সুখ থেমে যায়
নিরুপায় যাত্রায়।


সোমবার, ২৫ মে, ২০১৫

কবিতার প্রহর ১৬

বাজিছে দামামা বাঁধরে আমামা

কাজী নজরুল ইসলাম


বাজিছে দামামা বাঁধরে আমামা
শির উঁচু করি মুসলমান।
দাওয়াত এসেছে নয়া যমানার
ভাঙ্গা কেল্লায় ওড়ে নিশান।।

মুখেতে কালেমা হাতে তলোয়ার,
বুকে ইসলামী জোশ দুর্বার,
হৃদয়ে লইয়া এশক আল্লাহর
চল আগে চল বাজে বিষান।
ভয় নাই তর গলায় তাবিজ
বাঁধা যে রে তোর পাক কোরান।।

নহি মোরা জীব ভোগ- বিলাসের,
শাহাদাত ছিল কাম্য মোদের,
ভিখারির সাজে খলীফা যাদের
শাসন করিল আধা জাহান-
তারা আজ পড়ে ঘুমায়ে বেহুঁশ
বাহিরে বহিছে ঝড় তুফান।।

ঘুমাইয়া কাজা করেছি ফজর,
তখনো জাগিনি যখন যোহর,
হেলা ও খেলায় কেটেছে আসর
মাগরিবের আজ শুনি আজান।
জামাত শামিল হওরে এশাতে
এখনো জমাতে আছে স্থান।।

শুকনো রুটিকে সম্বল ক’রে
যে ঈমান আর যে প্রানের জোরে
ফিরেছে জগত মন্থন ক’রে
সে শক্তি আজ ফিরিয়ে আন।
আল্লাহ আকবর রবে পুনঃ
কাঁপুক বিশ্ব দূর বিমান।।
 

বুধবার, ৬ মে, ২০১৫

কবিতার প্রহর ১৫

এপিটাফ 

আল মাহমুদ

 

রক্তের উৎসধারা কারা আনে? কারা গায় আল্লাহর বিজয়?
ছবি কৃতজ্ঞতা : গুগল ইমেজ
আমার সালাম শুধু বলে দিও, বলো, নেই ভয়।
ভয় নেই, হে অক্ষয় অবিনাশী আত্মার পাখিরা
তোমাদের কলকণ্ঠে ছিঁড়ে যাবে আকাশের শিরা।
ভেঙে যাবে মেঘপুঞ্জ, খুলে যাবে নীলিমার খিল
পৃথিবীর দৃশ্য ছেড়ে শুরু হবে চিরঞ্জীব দৃশ্যের মিছিল।
সেখানেই বেঁচে থাকা, সেই শুরু গায়েবের ঘর
বিদ্যুৎ বিভায় হলো উদ্ভাসিত যাদের কবর।

আমরা পৃথিবীবাসী শুধু দেখি রক্ত আর ক্লেদ
বুঝি না মৃত্যুর ভাষা, সত্য আর মিথ্যার প্রভেদ।

শুক্রবার, ১ মে, ২০১৫

কিছু কথা অমলিন

জগদ্বিখ্যাত ফার্সি কবি শেখ সাদি (রহঃ) এঁর জ্ঞান ও প্রজ্ঞার সঞ্চারিত বাণী 'গুলিস্তাঁ' ও 'বুস্তাঁ' এ গ্রন্থ দু'টি যা বাংলা ভাষা সহ অনূদিত হয়েছে বিভিন্ন ভাষায়। বাংলা অনুবাদ পড়তে গিয়েই মাঝে মাঝে এর কথার গভীরতায় খেই হারিয়ে ফেলেছি। তারপরও মনে হয়েছে যদি মূল ভাষায় পড়তে পারতাম তাহলে হয়ত নান্দনিকতার আরেক রূপ দেখতে পেতাম!  অসংখ্য ভালোলাগার মাঝে দু-চার ছত্র।


- জ্ঞানীলোক তখনই কথা শুরু করে অথবা খাবারের মধ্যে হাত দেয়, যখন না বললে ক্ষতি হয় অথবা না খেলে মারা যায়। এভাবে তাদের কথা জ্ঞানপূর্ণ থাকে এবং খাদ্যে তার স্বাস্থ্যের জন্য উপকার হয়।

- বিরান জঙ্গল ও বালুময় ময়দানে পিপাসার্ত ব্যক্তির মুক্তা ও ঝিনুক দ্বারা কি উপকার হয়? তা থাকা আর না থাকা সমান। খাদ্যশুন্য ব্যক্তি যখন ক্ষুধায় ঢলে পড়ে, তখন কোমরে বাঁধা স্বর্ণ তার কি উপকারে আসে!

- যখন তুমি প্রতিযোগিতার আশংকা দেখো, তখন ধৈর্য অবলম্বন কর। কেননা নম্রতা প্রতিযোগিতা বন্ধ করে। নম্র ব্যবহার ও মিষ্টি ভাষায় একটি উগ্র হাতিকেও চুল দিয়ে বেঁধে রাখা যায়। অতএব, তুমি যেখানেই লড়াই দেখবে, নম্র ব্যবহার কর। কেননা, রেশম অতি নরম কিন্তু তা ধারালো অস্ত্র দ্বারা কাটা যায় না।

- কখনো বন্ধুর কাছে নিরাপদে বসবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত ঐ বন্ধুর অভ্যাস সম্পর্কে না জানবে। ঐ রকম শত্রুর দাঁতের জখম অত্যন্ত গভীর, যাকে দেখতে বন্ধুর মতো দেখায়।

- ঐ বন্ধুর সাক্ষাতে আমার কষ্ট হয়, যে আমার খারাপ স্বভাব কে ভালো বলে, আমার দোষসমূহকে বিজ্ঞতা বলে মনে করে এবং আমার কাঁটাগুলোকে গোলাপ-চামেলি বলে। কে এমন দুশমন আছে যে, আমাকে আমার দোষগুলো ধরে দেয়?

- দানের বৃক্ষ যেখানেই শিকড় বসায়, তার ডালপালা আসমান হতেও উপরে চলে যায়। তুমি যদি তা হতে ফল খেতে চাও, তবে কখনো দান করে ইহসান স্বরূপ করাত দিয়ে তার শিকড় কেটে দিও না। তোমাকে সম্পদ দান করে নেকী করার শক্তি দেয়া হয়েছে এজন্য যে, তুমি খোদার শোকর আদায় করো।