মঙ্গলবার, ১৮ এপ্রিল, ২০১৭

কবিতার প্রহর ২১

ঝরোকায়

ফররুখ আহমদ


মুসাফির জনতার মৃদুশব্দ নিম্নমুখ নীল পেয়ালায়
মিশে গেল আকাশের স্তব্ধ ঝরোকায়!
সুর্মা পাহাড়ে লুপ্ত অগ্নিবর্ণ গুলরুখ শিখা।

রাত্রি আজ গাঢ় ঘন! মন
দক্ষিণ হাওয়ায় ভেসে মুসাফির উজানী-পবন,
গন্ধ খুঁজে ফেরে।

আকাশেরে করিয়া চৌচির
তার কান্না লুটে পড়ে
উত্তর সাগর তীরে দক্ষিণের সামুদ্রিক ঝড়ে,
সন্ধান করে সে ইতস্তত
নীড় তাঁর শ্রাবণের পাখীদের মত।

গন্ধ আসে দূরান্তর হ'তে।
হে প্রিয়! ভেসেছি আমি দীর্ঘ নওবাহারের ঘন নীল স্রোতে,
তখনি তোমার
ও-সুরভি ভার
স্পর্শ করি গেছে বারে বারে;
প্রখর আতসী স্রোতে ভেসে আমি চাইনি তোমারে।

আজ আমি খুঁজে মরি
পাতায় পাতায়, ঘাসে ঘাসে,
পাই না তোমাকে। শুধু বহু দূ'র হ'তে গন্ধ আসে
ভেসে যায় মাঠ, মন মুহুর্তের রক্তিম প্রশ্বাসে।
পাই না তোমারে।
 ------------------------
মুগ্ধ মন আকুল সৌরভে
নাহি জানি ভুলেছে সে কবে
রজনীগন্ধার স্নিগ্ধ ভীরু বাতায়ন,
রুদ্ধ কারা দ্বার ভাঙি'আজ সে করিছে দূরে কার অন্বেষণ!
নৈশ বাতাসের তীরে
আঁধারের বুক চিরে
নেমে আসে ঘুম।

                               মনে হয় আকাশ কুসুম
                               তোমার সন্ধান।
তবু লাগে জোয়ারের টান,
সুপ্তির অতল যেয়ে হানা দেয় জাগ্রত চেতনা,
কী অসহ্য বেদনায় লাগে বুকে সৌরভ -মূর্ছনা!
বন-চামেলির স্রোতে ভেসে যাই কোথায় সুদূরে
ভারাক্রান্ত তনু ছেড়ে মন আজ ফেরে ঘুরে ঘুরে__
                                             দক্ষিণ বাতাসে
নিজেক হারায়ে ফেলে ছুটে চলে ব্যাকুল আশ্বাসে।
প'ড়ে থাকে ধুলিমুঠি, প'ড়ে থাকে ভ্রান্ত অহংকার__
ব্যথাতুর হ'য়ে ওঠে সমগ্র চেতনা, সত্তা, মনের কিনার।
ধূলিতলে মিশে যায় রজনীগন্ধার- সুঠাম, সুগোল তনুতল,
ফোটায়ে বিশুভ্র দল, ঝরায়ে সুরবি অনর্গল
অরণ্য হেনার ঝড়ে সৌরভ মর্মরে__
                ভুলে যেয়ে আবর্তের টান,
অন্তরের ঘ্রাণ,
পাপড়ির রূপ ছিড়ে খোঁজে সে গভীর মূলে সুরভি বিতান...


(সংক্ষেপিত)

শুক্রবার, ১৪ এপ্রিল, ২০১৭

কবিতার প্রহর ২০

ক্লান্তি

ফররুখ আহমদ


আমার হৃদয় স্তব্ধ, বোবা হ'য়ে আছে বেদনায়
যেমন পদ্মের কু'ড়ি নিরুত্তর থাকে হিমরাতে
যেমন নিঃসঙ্গ পাখী একা আর ফেরেনা বাসাতে;
তেমনি আমার মন মুক্তি আর খোঁজেনা কথায়।
যখন সকল সুর থেমে যায়, তারা-রা হারায়,
নিভে যায় অনুভূতি-- আঘাতে, কঠিন প্রতিঘাতে,
নিস্পন্দ নিঃসাড় হয়ে থাকে পাখী, পায় না পাখাতে
সমুদ্রপারের ঝড় ক্ষিপ্র গতি নিশান্ত হাওয়ায়।

মুখ গুঁজে পড়ে আছে সে পাখীর মত এ হৃদয়
রক্তক্ষরা । ভারগ্রস্ত এ জীবন আজ ফিরে চায়
প্রাণের মূর্ছনা আর নবতর সৃষ্টির বিস্ময়,
উদ্দাম অবাধ গতি, বজ্রবেগ প্রমুক্ত হাওয়ায়;
অথচ এখানে এই মৃত্যু -স্তব্ধ রাত্রির ছায়ায়
রুদ্ধ আবেষ্টনে আজ লুপ্ত হয় সকল সঞ্চয় ।।

 

শনিবার, ৭ জানুয়ারি, ২০১৭

কিছু ছন্নছাড়া সময়ের গল্প ৬

তরঙ্গের ছায়া কি কোথাও পড়ে না!
নাকি অমন স্বচ্ছ বুকের ছায়া হতে নেই?
অন্যেরটা বয়ে বেড়ানোতেই তার স্বার্থকতা?

এই ক্ষণিকের জীবনে পরম পাওয়া বলে তো কিছু নেই,
তাই নাইবা জানলো লোকে
দুখের দীর্ঘ মাস্তুল বুকে
আঘাত করে গেলে
তা কেমন দেখায় দেখতে...

 

শনিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০১৬

কবিতার প্রহর ১৯

বারুদগন্ধী মানুষের দেশে

আল মাহমুদ



শুধু ঝরে পড়া আর মরে যাওয়া ছাড়া অন্য কিছু দেখাও আমাকে
হে বারুদগন্ধী মানচিত্র, কেন এত প্রাণের পিপাসা
চারদিকে চেয়ে দেখি গর্ত শুধু, ডিম রাখা দোয়েলের বাসা
আমার আত্মার ছবি, এই ঝরা আর মরার বিপাকে!
লক্ষ লক্ষ পাখি বুঝি ডিম রেখে উড়ে গেছে দূরে।
দেখি চেয়ে পাতা ঝরে, ফুল ঝরে, ঝরে যায় কুঁড়ি
হাওয়ায় খঞ্জনার গন্ধ লেগে আছে।  অদৃশ্য নূপুরী
সেই পক্ষী ফেরেনি তো নিজ নীড়ে
আমার আত্মায়।
হে বারুদগন্ধী মানচিত্র বন্ধ কর মৃত্যুর তামাশা
বন্ধ হোক ঝরে পড়া,  মরে যাওয়া হাওয়ার ক্রন্দন
এই অন্ধ চোখ দু'টি  হয়ে যাক হেমন্তের খুব ভোরবেলা
তোমার সবুজ থেকে
খুলে ফেল মৃত্যুর মেখলা।

কবিতার প্রহর ১৮

অসমাপ্ত

আল মাহমুদ

 

যতো দেখি, মনে কোন সমাপ্তি জাগে না।
আমার কি আরম্ভ ও ছিলো?
মনে পড়ে ধুলো পায়ে হাঁটা
আর বিশ্রামের ঠাঁইগুলো ছবি হয়ে ভাসে।
চিরকাল পাখি ওড়া
চিরকাল নদী, নৌকা।
তরঙ্গের মাঝখানে ছায়া পড়ে, ছলকায়
দীর্ঘ এক দর্পিত মাস্তুল -
এই আমি। নিরারম্ভ।
অনি:শেষ আত্মার আওয়াজ।

শুক্রবার, ১৪ অক্টোবর, ২০১৬

টুকরো জীবন ৪

শরতের বিকাল গুলো বড্ড পানসে আজকাল।
একঝাক রঙিন ঘুড়ি বুকে নিয়ে স্বপ্নাতুর আকাশের আনত দৃষ্টি,
ক্ষণিকের ব্যবধানেই,
কেমন কাটা ঘুড়ির শুণ্যতা পুষে নিয়ে হারিয়ে যায়  
ঘোলাটে মেঘের আড়ে,
কোন তরঙ্গঢঙে উদ্বেলিত হয়ে নয়!

ভেজা কাকটার গৃহী হওয়ার শখ ছিল,
কিন্তু কোথায় এক আকিঞ্চন স্বপ্নের মৃত্যুতে,
বড় বড় বৃষ্টির ফোঁটারা
খুব করে নাড়িয়ে দিয়ে গেলো
জানালার বা'দিকের ঐ কদম গাছটা।

তার পরের গল্পের খোঁজ আর কেউ রাখে না,
গড়িয়ে যাওয়া দিন-রাতে তো আর কোন ব্যত্যয় ঘটে না।
অগুনতি রাতের হাল ভেঙে,
হৃদয়ের কাঠঠোকরা রা যে নোড়ায় জোয়ার এনেছিল,
সেখানে এখন ভাটির টান।

সে টান বড় শক্ত, মায়াহীন।
রাখেনি বালুকাবেলায় নিঃসঙ্গ গাঙচিলের শেষ পদচিহ্ন টুকুও...


 


শুক্রবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬

কিছু ছন্নছাড়া সময়ের গল্প ৫

courtesy: pexels.com
মাঝে মাঝে ইচ্ছে হয়                            
আমিও হই,
উড়ে যাওয়া বকের দুধসাদা পাখার মতোন।

বদ্ধতার আগল ছিঁড়ে
পতিত মনের বেড়ে উঠা আগাছার ভিড়ে।

আমারও হউক,
ক্লান্তিহীন দু'চোখ।
খুঁজে ফেরে সর্বস্ব নিমিষে ভাসায়
দূর সমুদ্রের বুকে,
নতুন চরের আশায়।

পৃথিবীর পঙ্কিল মন
যার পায়নি ছোঁয়া...